Rejinagar Byelection বিদ্যুৎ মৈত্র: পুজোর ঢাক বাজার আগেই মুর্শিদাবাদে নির্বাচনের ঢাক বাজিয়ে দিল কমিশন। রেজিনগর ও নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন হবে অক্টোবরের ৬ তারিখ। এই আসনে সরকারিভাবে আম জনতা উন্নয়ন পার্টি ছাড়া এখনও কোনও রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হুমায়ুন কবীর। নিজের ছেড়ে যাওয়া আসনে ছেলে গোলাম নবি আজাদকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন চলতি বছর মে মাসে। সেইমতো দেওয়াল লিখনও শুরু হয়েছে রেজিনগরের অলিগলিতে। উপ-নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার পরে এদিন জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হুমায়ুন বলেন, ” ভোট হয়তো কম পড়বে উপনির্বাচনে। কিন্তু জয়ের মার্জিনে কোনও ফারাক হবে না।” প্রসঙ্গত, এ বছর বিধানসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদের ৭০, রেজিনগর বিধানসভায় মোট ভোট পড়েছিল ২ লক্ষ ৩৯ হাজার ২৯৫। তারমধ্যে ৫১.৬২ শতাংশ অর্থাৎ ১ লক্ষ ২৩ হাজার ৫৩৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন হুমায়ুন। তবে রাজনীতির কারবারীদের দাবি, সাধারণ নির্বাচনে মানুষ তৎকালীন শাসকদলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। শাসক বিরোধীতার সঙ্গে মিশেছিল বাবরি মসজিদের হাওয়া। তার ফলে একচেটিয়া ভোট পেয়েছিলেন এজেইউপি-র প্রতিষ্ঠাতা। বিজেপি ক্ষমতায় এসে সেই হাওয়া বেশ খানিকটা ফিকে হয়েছে। উপনির্বাচনের লড়াই মূলত দাঁড়িয়ে গিয়েছে বিজেপি আর এজেইউপি-র মধ্যে।
কিন্তু উন্নয়নের প্রশ্নে এখনও সরব রেজিনগর বিধানসভার ভোটাররা। বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকাকালীন এখানে শিল্পতালুকের স্বপ্ন দেখেছিলেন মানুষজন। তৃণমূলের ১৫ বছর রাজত্বকালে সেই শিল্পতালুক শেষ পর্যন্ত বেহাত হতে বসেছিল। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাব্বিশের নির্বাচনে নামার আগে একবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ৫৬১ বিঘা সেই জমি নিয়ে গত ডিসেম্বরে নেড়েচেড়ে দেখেও এসেছিলেন তৎকালীন জেলাশাসক। কিন্তু তৃণমূল ভোটে হেরে যাওয়ায় বিষয়টি ফের হিমঘরে চলে যায় বলে দাবি। এই রেজিনগরে না আছে কলেজ, না আছে চিকিৎসার জন্য ভাল হাসপাতাল। রেলস্টেশন আছে কিন্তু সেটাও প্রান্তিক স্টেশন হিসেবেই গণ্য হয়। এই রেজিনগরে আছে মীর মদনের সমাধিস্থল। ভারতীয় পুরাতত্ব সর্বেক্ষণ দ্বারা স্বীকৃত এই সমাধিস্থল। তবু পর্যটকের কাছে তাঁর পরিচিতি তেমন নেই। নেই কোনও সরকারি উদ্যোগ। তবে কি শুধুই রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের ভোটে জিতিয়ে দেওয়াই কাজ মানুষজনের? বিধানসভার মানুষজন কি বঞ্চিতই থেকে যাবেন বছরের পর বছর?
বিজেপি’র বহরমপুর সংগঠনের সভাপতি মলয় মহাজন বলছেন, ” এলাকার উন্নয়ন করতে পারলে আমরাই পারব। আর কারও সেই ক্ষমতা নেই।” ২০২৬ সালে ভোটার তথ্যানুসারে এই বিধানসভায় মহিলা ভোটারের সংখ্যা ১ লক্ষ ২২ হাজার ৪৯০ জন। যাদের প্রায় প্রত্যেকে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’এর উপভোক্তা ছিলেন। অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে ইতিমধ্যে সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে। মলয় দাবি করছেন, ” রেজিনগরে ৬০ হাজার মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন।” হাসপাতালের প্রশ্নেও মলয়ের গলায় উন্নয়নের সুর। তিনি বলেন, ” মারুঠিয়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উন্নয়নের জন্য সরকার এক কোটি ৪০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে। শক্তিপুর ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র সংস্করণের জন্য প্রস্তাব পাঠান হয়েছে।” রেজিনগর পূর্ব ও পশ্চিমকে ভাগ করে চলে গিয়েছে ভাগীরথী। এই দুই দিকে রেজিনগরের প্রায় এগারোটি অঞ্চলের মানুষকে দৈনিক নদী পারাপার করতে হয়। মলয় বলেন, ” এইভাবে নদী পারাপারের দিন শেষ হবে আমাদের সরকারের আমলেই। জেলাশাসক তাঁর টিম নিয়ে গিয়ে গড়দোয়ারা সেতুর নির্মাণস্থল পরিদর্শন করে এসেছেন।”
হুমায়ুন বলছেন, “এর আগে তৃণমূল সরকার দিল্লির লাড্ডু দেখিয়ে এলাকার উন্নয়ন না করে মানুষকে ধোঁকা দিয়েছে। বিজেপি সরকার মানুষের দায়িত্ব নিয়েছে। আমরা বিরোধী আসনে আছি। আমাদের সীমিত ক্ষমতা দিয়ে যতটুকু উন্নয়ন করা সম্ভব হবে তা নিশ্চয় করব।” জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অসীম রায় এলাকার উন্নয়নের প্রশ্নে বলেন, ” মুর্শিদাবাদের মানুষকে সেই প্রমাণ দেওয়া আমাদের বাতুলতা। ‘৭৭ সাল থেকে কংগ্রেস বাংলায় ক্ষমতায় নেই। কিন্তু যেখানে যখন মানুষ আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে আমরা সেই দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছি। জেলার মানুষের দরকারে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।” চলতি বছর সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস এই আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। তাঁদের প্রার্থী জুলু শেখ ৪ হাজার ১০১টি ভোট পেয়েছিলেন।দলীয় সূত্রে জানা যায়, কংগ্রেস তাঁর বদলে প্রার্থী হিসেবে অন্য কাউকে দাঁড় করানোর কথা ভাবছে। উন্নয়নের প্রশ্ন এড়িয়ে কালিঘাট তৃণমূলের সদস্য জেলা পরিষদের হক চৌধুরী বলেন, “আমরা নির্বাচনে লড়াই করবো এটুকু বলতে পারি। দু একদিনের মধ্যে প্রার্থীও ঘোষণা হয়ে যাবে।”
সিপিএমের জামির মোল্লা এই নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে বিজেপির উন্নয়নের হাতিয়ারের সমালোচনা করে ডবল ইঞ্জিন সরকারকে ‘জুমলা’ সরকার বলেও দাবি করেছেন। তিনি বলেন, “ডবল ইঞ্জিনের সরকার ডবল গতি নিয়ে ভাঙচুর শুরু করেছে। সে হকার উচ্ছেদ থেকে শুরু করে পথচারীদের ওপর অত্যাচার থেকে শুরু করে একেবারে বস্তিবাসীদের ওপর অত্যাচার। এখান থেকেই পরিষ্কার যে ডবল ইঞ্জিনের সরকার যে উন্নয়নের কথা বলেছিল সোনার বাংলা গড়বে বলেছিল সেই সোনার বাংলাকে ভাঙছে ওরা। ভাঙার উন্মত্ততায় খেলায় নেমেছে তারা। জিনিসপত্রের দাম কমানোর কথা বলেছিল কমায়নি। সাড়ে চারশো টাকা করে গ্যাসের দাম দেবে বলেছিল, দুশো ইউনিট বিদ্যুৎ ফ্রি দেব বলেছিল। এখন হাজার টাকা গ্যাসের দাম। চিনির দাম তো আকাশ ছুয়েছে।” শিল্পায়নের প্রশ্নেও বিজেপিকে বিজেপিকে বিঁধেছেন এই সিপিএম নেতা। তিনি বলেন, “মুর্শিদাবাদ শিল্পবিহীন একটা জেলা। শিল্পের উন্নয়নের প্রশ্নে আমরা চাই বরাবরই শিল্প হোক। কিন্তু এই সরকারের সেই সদিচ্ছা নেই। যে কারখানাগুলো আছে সেগুলো তো আস্তে আস্তে বিজেপি বিক্রি করে দিচ্ছে। এবং কারখানাগুলোর পুনর্জীবনের দরকার, যেখানে সেটাও করছে না। সিঙ্গুরের শিল্প কারখানা বন্ধ করার সময় মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে হাত দিয়েছিল তো রাজনাথ সিং। একটি শিল্প তাড়ুয়া দল, তারা কি করে শিল্প করবে ?”
















