এখন খবরমধ্যবঙ্গ নিউজপরিবেশবিনোদনহেলথ ওয়াচখেলাঘরে বাইরেলাইফস্টাইলঅন্যান্য

Erosion Workshop ভাঙ্গনের সমাধানের খোঁজে কর্মশালা

Published on: September 29, 2026
Erosion Workshop

Erosion Workshop  নদী কখনও চুপচাপ সরে যায়। কখনও রাতারাতি গিলে নেয় বসতবাড়ি, চাষের জমি, রাস্তা কিংবা স্মৃতির কোনও চেনা ঠিকানা। নদীভাঙন তাই মুর্শিদাবাদ ও মালদার মানুষের কাছে শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের নাম নয়—এটি বহু পরিবারের প্রতিদিনের আশঙ্কা।সেই ভাঙনের কারণ কী? সমাধানের পথ কোথায় ? আর নদীভাঙনের শিকার মানুষের কথা কীভাবে আরও দায়িত্বশীলভাবে পৌঁছে দেওয়া যায় বৃহত্তর সমাজের কাছে ?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই গঙ্গা, পদ্মা ও ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী এলাকার সাংবাদিক ও কলেজ পড়ুয়াদের নিয়ে মুর্শিদাবাদের ধূলিয়ানে অনুষ্ঠিত হল দু’দিনের বিশেষ কর্মশালা।

Erosion Workshop Dhulian

১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বরের এই কর্মশালায় মালদা ও মুর্শিদাবাদের নদী তীরবর্তী এলাকার ৩৫ জন সাংবাদিক ও কলেজ পড়ুয়া অংশ নেন। কর্মশালার মধ্য দিয়েই শুরু হল নদীভাঙন সমস্যা নিয়ে এক বছরব্যাপী অনুসন্ধান, সচেতনতা ও কার্যক্রমের পথচলা।

Erosion Workshop ভাঙনের কথা যারা বছরের পর বছর লিখেছেন, তাঁদের সম্মান

কর্মশালার প্রথম দিনেই ছিল একটি বিশেষ পর্ব। গঙ্গা, পদ্মা ও ভাগীরথীর ভাঙনকে বছরের পর বছর সংবাদমাধ্যমের পাতায় এবং মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন যে সাংবাদিকরা, তাঁদের ছয়জনকে সংবর্ধনা জানানো হয়।

ধূলিয়ানের একটি বেসরকারি অনুষ্ঠানবাড়িতে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মানিত করা হয় আজকাল-এর সাংবাদিক প্রদীপ দে, এশিয়ান এজ-এর সাংবাদিক প্রাণময় ব্রহ্মচারী, আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক বিমান হাজরা, উত্তরবঙ্গ সংবাদের সাংবাদিক কল্লোল মজুমদার, আজকাল-এর সাংবাদিক অভিজিৎ চৌধুরী এবং দ্য টেলিগ্রাফ-এর সাংবাদিক আলমগীর হোসেনকে।

নদীভাঙনকে যাঁরা খুব কাছ থেকে দেখেছেন, বছরের পর বছর ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে মানুষের কষ্টের কথা শুনেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা উঠে আসে আলোচনায়।

সাংবাদিক প্রদীপ দে বলেন, নদীভাঙন দুই জেলার জন্যই একটি বড় সংকট। তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি তুলে ধরেন ভাঙনের সঙ্গে মানুষের জীবন ও জীবিকার গভীর সম্পর্কের কথা।

Erosion Workshop Dhulian (5)

Erosion Workshop উদ্বোধনী মঞ্চে নদী, সাংবাদিকতা ও মানুষের কথা

কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ফরাক্কা ভারত সেবাশ্রমের স্বামী মধুরানন্দ জি মহারাজ, ইউনিসেফের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুচরিতা বর্ধন, প্রসার ভারতীর কনসাল্টিং এডিটর প্রসেনজিৎ বক্সী এবং নদী বিশেষজ্ঞ ড. বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী।

ছয় প্রবীণ সাংবাদিক তাঁদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে। তাঁদের কথায় উঠে আসে নদীভাঙনের বহুস্তরীয় বাস্তবতা—নদীর গতিপথ বদল থেকে মানুষের ঘরবাড়ি হারানো, জীবিকার সংকট থেকে প্রশাসনের ভূমিকা, এবং সবচেয়ে বড় কথা, ভাঙনকবলিত মানুষের কণ্ঠস্বর সংবাদমাধ্যমে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা।

Erosion Workshop শুধু খবর নয়, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পাঠ

উদ্বোধনী পর্বের পর শুরু হয় কর্মশালার মূল প্রশিক্ষণ। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নিয়ে সাংবাদিক ও পড়ুয়াদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন ইউনিসেফের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুচরিতা বর্ধন।

Erosion Workshop Dhulian (7)

একটি প্রতিবেদন কীভাবে আরও তথ্যনির্ভর, মানবিক এবং প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে, কীভাবে মানুষের বক্তব্য ও তথ্যকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা যায়—সেসব বিষয় উঠে আসে তাঁর আলোচনায়।

এরপর অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে দেওয়া হয় নির্দিষ্ট কাজ। লক্ষ্য একটাই—কর্মশালার আলোচনা যেন শুধু সভাকক্ষের মধ্যে আটকে না থাকে, বরং বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়।

Erosion Workshop সভাকক্ষ ছেড়ে ভাঙনের মাঠে

দ্বিতীয় দিনের সকালটা ছিল অন্যরকম। কাগজ-কলম, ক্যামেরা ও নোটবুক নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা বেরিয়ে পড়েন ভাঙনকবলিত এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি দেখতে। নদীর পাড়ে গিয়ে তাঁরা প্রত্যক্ষ করেন ভাঙনের চিহ্ন, মানুষের জীবনযাত্রা এবং নদীর সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই।

মাঠের সেই অভিজ্ঞতা ফিরে এসে রূপ নেয় প্রতিবেদনে। সাংবাদিক ও কলেজ পড়ুয়ারা দলবদ্ধভাবে তৈরি করেন বিভিন্ন প্রতিবেদন। অর্থাৎ, ভাঙনকে শুধু ‘দেখা’ নয়—দেখা, বোঝা, মানুষের কথা শোনা এবং সেই অভিজ্ঞতাকে তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদনে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়াই হয়ে ওঠে কর্মশালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

Erosion Workshop নদীকে বাঁচিয়ে ভাঙন মোকাবিলার ভাবনা

কর্মশালার মুখ্য প্রশিক্ষক ও নদী বিশেষজ্ঞ ড. বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী নদীর নিজস্ব গতিপথ ও চরিত্র বোঝার উপর জোর দেন। বন্যা ও ভাঙন মোকাবিলায় নদীবান্ধব পদ্ধতি, নদীর স্বাভাবিক চলাচল এবং আগাম সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে—নদীকে শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা নয়, নদীর স্বাভাবিক আচরণকে বুঝে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিপর্যয় মোকাবিলার প্রয়োজন।

Dhulian Erosion Biswajit Roy Choudhury

Erosion Workshop ভাঙন শুধু মাটি হারানোর গল্প নয়, জীবিকারও সংকট

নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও জমি হারানোর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় জীবিকা। এই বিষয়টিও উঠে আসে কর্মশালার আলোচনায়। নদীতীরবর্তী মানুষের বিকল্প রুজির সম্ভাবনা নিয়ে বক্তব্য রাখেন মালদার এমপ্লয়মেন্ট অফিসার ইনচার্জ, পরিবেশবিদ উন্মেষ মিত্র এবং শিক্ষক ও চিত্রগ্রাহক নয়ন সরকার।

Unmesh Mitra Workshop

আলোচনায় উঠে আসে নদী, চরাঞ্চল ও পাখিকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সম্ভাবনা। অর্থাৎ, যে নদী একদিকে মানুষের ঘর ও জমি কেড়ে নেয়, সেই নদী ও তার পরিবেশকেই কীভাবে নতুন জীবিকার সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা যায়—সেই ভাবনাও সামনে আসে।

Erosion Workshop সাংবাদিকতার ‘পাঠশালা’ হয়ে উঠল কর্মশালা

কর্মশালার শেষ পর্বে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের তৈরি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। সংবাদপত্র এবং ডিজিটাল মাধ্যমের উপযোগী সেই প্রতিবেদনগুলি খুঁটিয়ে দেখেন নেটওয়ার্ক ১৮ মিডিয়ার ম্যানেজিং এডিটর ধ্রুবজ্যোতি প্রামাণিক, প্রসার ভারতীর কনসালটিং এডিটর প্রসেনজিৎ বক্সী এবং ইউনিসেফের কমিউনিকেশন কনসালটেন্ট অমিতাভ দাস।

Erosion Workshop Dhulian (3)

প্রতিবেদনের বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে তথ্যের ব্যবহার, সংবাদ লেখার খুঁটিনাটি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উপযোগী উপস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত নানা দিক নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনায় যোগ দেন সুচরিতা বর্ধনও।

ধীরে ধীরে কর্মশালার ঘরটি যেন পরিণত হয় এক সাংবাদিকতার পাঠশালায়। একটি নদীভাঙনের খবর কীভাবে শুধুমাত্র ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান না হয়ে মানুষের জীবন, পরিবেশ, প্রশাসন এবং ভবিষ্যতের প্রশ্নকে সামনে আনতে পারে—সেই দিকটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়।

Erosion Workshop দুই দিনের কর্মশালা, কিন্তু পথচলা এক বছরের

দুই দিনের কর্মশালা শেষ হলেও উদ্যোগটি এখানেই শেষ নয়। আয়োজক IMAGIN-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নদীভাঙন সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজতে আগামী এক বছর ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে কার্যক্রম চালানো হবে।

Erosion Workshop Dhulian (10)

লক্ষ্য—নদীভাঙন নিয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ, মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া।

 

শেষ দিনে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিক ও কলেজ পড়ুয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সার্টিফিকেট। দুই দিনের অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে তাঁরা ফিরলেন নিজেদের এলাকায়—কিন্তু এবার শুধু নদী দেখার জন্য নয়, নদীর গল্প আরও গভীরভাবে বোঝার এবং সেই গল্প মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েই। দুই দিন ধরে কর্মশালার পাশপাশি ছিল নদী ভাঙ্গন নিয়ে শিল্পী মিজানুর খানের ছবির প্রদর্শনী।

Mizanur Khan

Erosion Workshop ‘কৃতী মুর্শিদাবাদী’ সম্মান

রবিবারের অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে IMAGIN Community Media-র পক্ষ থেকে ‘কৃতী মুর্শিদাবাদী’ সম্মান প্রদান করা হয় নেটওয়ার্ক ১৮ মিডিয়ার ম্যানেজিং এডিটর ধ্রুবজ্যোতি প্রামাণিক এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী সুদীপ রায়কে।

নদীভাঙনের তীব্র বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে তাই ধূলিয়ানের এই দুই দিনের কর্মশালা শুধু একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হয়ে থাকল না। বরং গঙ্গা, পদ্মা ও ভাগীরথীর তীরে বসবাসকারী মানুষের দীর্ঘদিনের প্রশ্ন—“নদীভাঙনের সমাধান কোথায়?”—তার উত্তর খোঁজার একটি দীর্ঘ পথচলার সূচনা হয়ে রইল।

 

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now