পরিস্থিতি না বদলালে অচিরেই আঁধার নামবে বিড়ি মহল্লায়

স্নেহাংশু চট্টরাজ:সাগরদিঘিঃ  সাগরদিঘিতে তৃণমূলের সর্বভারতীয় রাজ্য সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রবিবার সভা শেষে বিড়ি মহল্লায় শুরু হয়েছে জল্পনা। একদিকে যেমন মজুরি বাড়ার প্রতিশ্রুতিতে হাসি ফুটছে একাংশ বিড়ি শ্রমিকের মুখে। তেমনি আর একটি অংশের জিজ্ঞাসা, “কাজ বাড়বে তো?”
তবে বিড়ি শিল্পের রুগ্নতা নিয়ে দ্বিমত নয় কোনওপক্ষই। জঙ্গিপুরে কম বেশি এগারো লক্ষ বিড়ি শ্রমিক আছেন। সাগরদিঘিতে আছেন প্রায় ৮০ হাজার বিড়ি শ্রমিক। যাঁদের বড় অংশই মহিলা। বাড়ির পুরুষরা বাড়তি রোজগার করতে কেউ পাড়ি দিয়েছেন ভিন রাজ্যে। কেউ বা এলাকাতেই অন্য কাজে যুক্ত। কেউ হয় অন্যের জমিতে কাজ করছেন না হয় নিজের জমি চাষ করে দিন কাটাচ্ছেন।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে ২০২১ সালের অক্টোবরে বিড়ি মালিকদের সঙ্গে সরকার পক্ষ ও বিড়ি শ্রমিক সংগঠনের বৈঠক হয়েছিল। সেখানেই হাজারটা বিড়ি বাঁধলে নূ্ন্যতম ১৭৮ টাকা মজুরি ঠিক হয়েছিল। কিন্তু শ্রমিকদের দাবি, বাস্তবে তাঁরা হাতে পান ১৩০-১৫২ টাকা। জঙ্গিপুর মহকুমায় ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় দু’শো বিড়ি মালিক আছেন।
ঔরঙ্গাবাদ বিড়ি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাজকুমার জৈন বলেন, “ চুক্তি অনুযায়ী সেই মজুরি সর্বক্ষেত্রে কার্যকরী নয়। দশ থেকে পনেরো শতাংশ শ্রমিক হয়ত সেই মজুরি পায়, বাকিরা তা পায় না।” তবে এক্ষেত্রে মালিক সেই মজুরি দিলেও তা শ্রমিকের হাতে পৌঁছচ্ছে না তার মুখ্য কারণ বিড়ি বাঁধার কাজ কমে যাওয়া এমনটাই মনে করছেন তিনি। রাজকুমারের ব্যাখ্যা, “ কাজ কমে যাওয়ার দরুণ যা আসে তাই লাভ এই চিন্তায় শ্রমিক অল্প মজুরিতে কাজ করেন। পাশাপাশি মুন্সি যাঁরা এই বিড়ি বাঁধার বরাত নেন তাঁদের ভূমিকাও এক্ষেত্রে অস্বীকার করা যায় না।” তাঁর মতে, “ করোনার পর থেকে এই শিল্প নিম্নমুখী। জিএসটি-র প্রভাব পড়েছে শিল্পে। কম মজুরিতে বিড়ি বাঁধার লোকের অভাব নেই। আর তারাই এই বাজারটা গ্রাস করছে। ফলে যাঁরা ন্যায্য মজুরি দিচ্ছেন শ্রমিককে তারা বাজার হারাচ্ছেন। ফলে আগ্রহ কমছে।”
এই অবস্থাতে ফের মজুরি বেড়ে ২৩০-২৪০ টাকা হবে বলে কথা দিয়েছেন রাজ্যের শাসক দলের সেকেন্ড ম্যান। যা বাস্তবায়িত কতটা হবে তা নিয়ে ধন্দে বিড়ি মহল্লার গরিষ্ঠ শ্রমিক। জঙ্গিপুরের এক বিড়ি মালিক জাকির হোসেন শাসক দলের বিধায়ক। সাংসদ খলিলুর রহমান ওই এলাকার নূর বিড়ি কোম্পানির মালিক। চলতি উপনির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থী হয়েছেন আর এক বিড়ি মালিক বাইরন বিশ্বাস। তাঁর কোম্পানির শ্রমিকদেরও মজুরি নিয়ে রয়েছে নানান ক্ষোভ।
এছাড়াও বিড়ি শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিয়েও ক্ষোভ আছে। সাগরদিঘির অদূরে তারাপুরে বিড়ি শ্রমিকদের হাসপাতাল তৈরি হয়েছিল দু’হাজার সালে। সেই হাসপাতালের পরিষেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে ক্ষোভ জানালেন সিটু রাজ্য কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল শেখ। তিনি বলেন, “এই সাগরদিঘিতেও বিড়ি শ্রমিকদের জন্য হাসপাতাল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হল কৈ?” দিদির সুরক্ষা কবচও পৌঁছায় নি বিড়ি শ্রমিকদের ঘরে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল বিড়ি শ্রমিকদের মধ্যে মাত্র লাখ তিনেক শ্রমিকের প্রভিডেন্ট আছে। বাকিদের প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। গ্র্যাচুয়িটি ও নেই। অবসরের পরেও অনেকে এই কাজ করতে আসেন পেট চালাতে। রোজ হাজার বিড়ি বাঁধলে যা আয় হয় তাই দিয়ে চলে তাঁদের নিত্যদিন। কিন্তু “ভোট দিতে যেতে হয়” বলে দাবি সাবিনা খাতুনের। তিনি বলেন, “ মজুরি বাড়বে আমাদের শ্রমিকদের সুদিন ফিরবে এই আশাতেই ভোট দিতে যাই। কিন্তু এখনও তো সুদিন দেখতে পেলাম না।” তবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকা সর্বস্তরের আশঙ্কা ধুঁকতে থাকা বিড়ি শিল্পের পরিস্থিতি না বদলালে অচিরেই আঁধার নামবে মহল্লায়।