Prakritik Krishi একদিকে লাগামছাড়া রাসায়নিক সারের দাম, অন্যদিকে বছরের পর বছর অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগে চাষের জমির উর্বরতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা। এই দুই সমস্যার মাঝে দাঁড়িয়ে দিশেহারা বহু কৃষক। তাহলে কি সমাধান লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃতির কাছেই? সেই উত্তর খুঁজতেই এবার প্রাকৃতিক কৃষির উপর বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষি দপ্তর Agriculture Department of West Bengal ।
শুক্রবার বহরমপুরের রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠিত হয় ‘মাটির স্বাস্থ্যরক্ষায় প্রাকৃতিক কৃষি’ বিষয়ক এক বিশেষ কর্মশালা। কৃষি দপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন ব্লক থেকে আসা বহু কৃষক অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন কৃষি, প্রাণী সম্পদ উন্নয়ন এবং উদ্যান পালন দপ্তরের আধিকারিকরাও।
Prakritik Krishi কী আলোচনা হল কর্মশালায় ?
বর্তমানে অধিক ফলনের আশায় বহু ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে মাটির স্বাভাবিক জৈবগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কমছে মাটির উর্বরতা, পাশাপাশি পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের উপরও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। এই পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিক ও জৈব কৃষির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।
কর্মশালায় কৃষকদের সামনে প্রাকৃতিক কৃষির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। কীভাবে স্থানীয় জাতের বীজ ব্যবহার, জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি, নিয়মিত জীবামৃত ও বীজামৃতের প্রয়োগ এবং ফসল চক্র অনুসরণ করে রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা কমানো যায়, সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
Prakritik Krishi মুর্শিদাবাদের উপকৃষি অধিকর্তা (প্রশাসন) ডঃ উৎপল মণ্ডল বলেন, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর কথায়, “অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও ওষুধ ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাভাবিক স্বাস্থ্য অনেকটাই নষ্ট হয়েছে। কৃষকের স্বার্থে, চাষের স্বার্থে এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা অত্যন্ত জরুরি। কৃষকের কাছে মাটি মায়ের সমান। তাই মায়ের স্বাস্থ্য রক্ষার লক্ষ্যেই এই কর্মশালার আয়োজন।”
Prakritik Krishi তিনি আরও জানান, জেলার সাতটি ব্লককে ইতিমধ্যেই প্রাকৃতিক ও জৈব কৃষির জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে ধাপে ধাপে এই পদ্ধতির প্রসার ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কর্মশালায় কৃষকদের উৎসাহ দেখে আগামী দিনে আরও বেশি কৃষক প্রাকৃতিক কৃষির দিকে ঝুঁকবেন বলেও আশাবাদী তিনি।
ডঃ মণ্ডলের মতে, “এটি জৈব ও প্রাকৃতিক কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে আমরা ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। অনেকেই এই পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পেরেছেন এবং ভবিষ্যতে তা বাস্তবে প্রয়োগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।”
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন সারগাছি রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের সম্পাদক স্বামী বিশ্বময়ানন্দজী মহারাজ। তিনি শুধুমাত্র প্রাকৃতিক কৃষির উপকারিতা নিয়েই কথা বলেননি, কৃষকদের আত্মমর্যাদা ও আত্মজাগরণের বার্তাও দিয়েছেন।
Prakritik Krishi নিজের বক্তব্যে তিনি বলেন, কৃষিকাজকে কখনও ছোট করে দেখা উচিত নয়। সমাজে কৃষকের মর্যাদা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, অনেক সময় নতুন প্রজন্ম নিজেদের কৃষক পরিবারের সন্তান বলে পরিচয় দিতে সংকোচ বোধ করে। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে প্রকৃতি ও কৃষির প্রতি প্রকৃত সম্মান তৈরি হবে না।
স্বামী বিশ্বময়ানন্দজী আরও বলেন, জমিকে শুধু উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। পূর্বপুরুষদের মতো জমিকে সম্মান জানিয়ে কৃষিকাজ শুরু করার সংস্কৃতি ফিরে আসার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর মতে, প্রকৃতির সেবা এবং কৃষির মাধ্যমে সমাজকে সমৃদ্ধ করার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন।
কর্মশালায় উপস্থিত কৃষকরাও প্রাকৃতিক কৃষি সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করেন এবং বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে তার উত্তর পান। অনেকেই রাসায়নিক সারের ক্রমবর্ধমান মূল্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে, বিকল্প ও কম খরচের কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি হলে কৃষকরা উপকৃত হবেন।
Prakritik Krishi বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক কৃষি শুধু উৎপাদন ব্যয় কমায় না, দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্যও ফিরিয়ে আনে। পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এখন দেখার, বহরমপুরের এই কর্মশালা কতটা প্রভাব ফেলে মাঠ পর্যায়ে। তবে কৃষি দপ্তর, বিশেষজ্ঞ এবং কৃষকদের একাংশের বিশ্বাস, প্রাকৃতিক কৃষির প্রসার ঘটলে মুর্শিদাবাদে কৃষির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। সেই সঙ্গে ফিরতে পারে কৃষকের সুদিনও।
আরও পড়ুনঃ World Fisheries Day 2025 : কেন মৎস্যজীবীরা এখন পরিযায়ী শ্রমিক?
FAQ Prakritik Krishi প্রাকৃতিক কৃষি কেন দরকার ?
প্রাকৃতিক কৃষি আজ সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরতা কমছে, পরিবেশ দূষিত হচ্ছে এবং উৎপাদন খরচও বাড়ছে। প্রাকৃতিক কৃষি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে, জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করে এবং কৃষিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করে তোলে। এই পদ্ধতিতে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার হওয়ায় কৃষকের খরচ কমে এবং লাভের সম্ভাবনা বাড়ে। পাশাপাশি রাসায়নিকমুক্ত ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যও সুরক্ষিত থাকে। পরিবেশ, কৃষক এবং ভোক্তা—সবার স্বার্থেই প্রাকৃতিক কৃষির প্রসার অত্যন্ত জরুরি। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ কৃষি ব্যবস্থার পথ দেখায়।















